সিরাজুর রহমান#
ইউক্রেন সম্প্রতি রাশিয়ার অভ্যন্তরে পরিচালিত একাধিক সামরিক হামলার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ (SBU)-এর আলফা ইউনিটের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ সময়কালে দূরপাল্লার কমব্যাট ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত একাধিক বিমানঘাঁটিতে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
এসব অভিযানে আনুমানিক ১৫টি যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও সামরিক এরিয়াল সিস্টেম ধ্বংস বা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইউক্রেন দাবি করেছে। তবে এই দাবির সত্যতা এখনো পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সূত্র দ্বারা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া রাশিয়ার তরফে এ নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
আসলে ইউক্রেনের প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে রাশিয়ার অন্তত পাঁচটি এয়ারবেসে মোতায়েন থাকা বিভিন্ন ধরনের সামরিক বিমান ও হেলিকপ্টারের ওপর ড্রোন হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। ইউক্রেনীয় পক্ষের দাবি অনুযায়ী, এসব হামলায় রাশিয়ার এসইউ-৩০এসএম, এসইউ-৩৪, এসইউ-২৭, এসইউ-২৪ এবং মিগ-৩১ ধরনের যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি এমআই-২৮, এমআই-২৬ ও এমআই-৮ সিরিজের হেলিকপ্টার এবং একটি এএন-২৬ সামরিক পরিবহন বিমানের ধ্বংসের দাবিও করা হয়েছে। তবে যুদ্ধের শুরুঢ় পর থেকে রাশিয়ার একক কমব্যাট এয়ারক্রাফট হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৫৫টি কে এ-৫২ এলিগেটর এ্যাটাক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে (প্রায় ১২টি ক্ষতিগ্রস্ত)।
ইউক্রেনের দাবিকৃত এ বিষয়ে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমেও এই দাবিগুলো সীমিত গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়া তাদের নিজস্ব সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখে চলেছে, ফলে এ ধরনের দাবির পূর্ণাঙ্গ যাচাই অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উন্মুক্ত সূত্র ও যুদ্ধ বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ব্যালেস্টিক ও ক্রুজ মিসাইলের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক কমব্যাট ড্রোন ব্যবহার করেছে। এসব হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে হাইপারসনিক গতির ইস্কান্দার-এম, কিনঝাল, জিরকন এবং বিশেষ করে ওরেশনিক (এমআরবিএম) ব্যালেস্টিক মিসাইল অন্যতম।
রাশিয়ার তৈরি ওরেশনিক (Oreshnik) মিসাইল শব্দের গতির চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি দ্রুত (ম্যাক ১০) চলতে সক্ষম, যা ঘণ্টায় প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার (৮,০০০ মাইল) হয়। এই হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি তার প্রচণ্ড গতি ও সক্ষমতার কারণে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির মিসাইলের একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সব মিলিয়ে এই যুদ্ধে রাশিয়ার মিসাইল ও কমব্যাট ড্রোন ব্যবহারের মোট সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে, এই যুদ্ধে ইউক্রেন ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করে দেশটি ধীরে ধীরে নিজস্ব ড্রোন ও স্ট্রাইক সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।
এর ফলে সীমিত পরিসরে হলেও ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং এয়ার কমব্যাট ফ্লিটকে লক্ষ্য করে ব্যাপক মাত্রায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনের তরফে যা ছিল অনেকটাই পরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ভিত্তিক এক সমন্বিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়া।
যুদ্ধের একদিকে রাশিয়া ধারাবাহিকভাবে মিসাইল ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেনও রাশিয়ার সামরিক অবকাঠামো ও বিমান শক্তির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
উইকিপিডিয়া দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার আনুমানিক ২৬৭টি এবং ইউক্রেনের প্রায় ৩২৭টি যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও সামরিক পরিবহন বিমান ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সংখ্যা বাস্তবে যথেষ্ট কম বা বেশি হতে পারে।#
-- বিজ্ঞাপন ---
পূর্ববর্তী সংবাদ
‘ক্রিস্টিন’ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পুর্তোগাল এয়ারফোর্সের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান!

