ফলাফলের খাতায় ব্যর্থতা, মোবাইলের পর্দায় সাফল্যের নেশা!
ফেসবুক, টিকটক, ভিউ আর দ্রুত টাকা আয়ের মোহে কি হারিয়ে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের মনোযোগ?
কাজী আবুল মনসুর#
এক হাতে এইচএসসির ফলাফলের কাগজ, অন্য হাতে স্মার্টফোন। কাগজে হয়তো ব্যর্থতার খবর, অথচ মোবাইলের পর্দায় চলছে ভিউ, লাইক আর ফলোয়ার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। যে ফোনে জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য দরজা খোলা থাকার কথা, সেই ফোনই কি কখনো হয়ে উঠছে মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার অদৃশ্য ফাঁদ? যে বয়সে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, সে বয়সেই যদি কেউ রাত জাগে ভাইরাল ভিডিওর আশায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই,আমাদের নতুন প্রজন্ম কি ভুল পথে সময় ব্যয় করছে?
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর প্রশ্নটি আরও গভীর হয়েছে। ২০২৬ সালে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে হয়েছে ৪০ হাজার ৮৪। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফলাফলটি ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার।
এই পরিসংখ্যান কেবল পরীক্ষার খাতায় নম্বর কমে যাওয়ার হিসাব নয়। এটি আমাদের শিক্ষা, পরিবার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নতুন প্রজন্মের সময় ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। অবশ্যই ফলাফলের অবনতির পেছনে শিক্ষার মান, পাঠদানের দুর্বলতা, শেখার ঘাটতি, পরীক্ষার প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতিসহ নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি এমন এক বাস্তবতাও রয়েছে, যা এখন প্রায় প্রতিটি ঘরে দৃশ্যমান,পড়ার টেবিলে বই খোলা, অথচ মন পড়ে আছে মোবাইল ফোনে।
পড়ার টেবিলে বই, মনোযোগের কেন্দ্রে মোবাইল
একসময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল টেলিভিশন, খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে এমন এক যন্ত্র, যা একই সঙ্গে শিক্ষার উপকরণ, বিনোদনের মাধ্যম এবং মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার,স্মার্টফোন। মোবাইল ফোনে শিক্ষামূলক ভিডিও দেখা যায়, অনলাইন ক্লাস করা যায়, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু একই ফোনে রয়েছে ফেসবুক, টিকটক, রিলস, শর্ট ভিডিও, গেম, মেসেঞ্জার ও অসংখ্য বিনোদনমূলক কনটেন্ট। ফলে শিক্ষার্থী যখন পড়ার জন্য ফোন হাতে নেয়, তখন তার সামনে হাজির হয় মনোযোগ বিচ্যুতির অগণিত দরজা। একটি নোটিফিকেশন, একটি নতুন পোস্ট, একটি ভিডিও, এভাবেই পড়ার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। শিক্ষার্থী হয়তো ভাবে, মাত্র কয়েক মিনিট দেখবে। কিন্তু সেই কয়েক মিনিট কখন আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টায় গড়ায়, অনেক সময় সে নিজেও বুঝতে পারে না। এরপর আবার বইয়ে ফিরে এলেও আগের মনোযোগ ফিরে পেতে সময় লাগে। সমস্যাটি শুধু সময় নষ্টের নয়; এটি মনোযোগের অভ্যাস বদলে দেওয়ারও। দীর্ঘ লেখা পড়া, কঠিন বিষয় বোঝা, অঙ্কের সমাধানে ধৈর্য রাখা কিংবা কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার জন্য যে স্থির মন দরকার, দ্রুত বদলে যাওয়া ভিডিও ও ছোট ছোট কনটেন্টের অভ্যাস সেই স্থিরতাকে দুর্বল করতে পারে।
ফেসবুক: যোগাযোগের মাধ্যম, নাকি সময়ের অদৃশ্য গ্রাসকারী?
ফেসবুক নিজে কোনো এককভাবে ক্ষতিকর মাধ্যম নয়। এটি যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান, সংবাদ, শিক্ষা ও সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ব্যবহার যখন প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে অভ্যাসে, আর অভ্যাস থেকে নিয়ন্ত্রণহীনতায় পৌঁছে যায়, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দৈনন্দিন জীবনে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কৈশোর ও তরুণ বয়সে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বন্ধুদের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রবণতা এবং নতুন কিছু দেখার আগ্রহ প্রবল থাকে। ফেসবুকের লাইক, কমেন্ট, শেয়ার কিংবা নতুন নোটিফিকেশন তাদের বারবার ফোনের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে। অন্যের ছবি, সাফল্য, বিনোদন কিংবা বিতর্কে ডুবে থাকতে থাকতে নিজের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পিছিয়ে পড়তে পারে। কেউ হয়তো বই খুলে বসেছে, কিন্তু কয়েক মিনিট পরপর ফোন দেখছে। কেউ পড়ার বিরতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে আর বের হতে পারছে না। আবার কেউ রাত জেগে ভিডিও বা পোস্ট দেখতে দেখতে ঘুমের সময় নষ্ট করছে। পরদিন ক্লাসে বা পড়ার টেবিলে তার মনোযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ভেঙে যেতে পারে। পরীক্ষার আগে যে প্রস্তুতি কয়েক মাস ধরে নেওয়ার কথা, তা শেষ মুহূর্তের মুখস্থনির্ভর চাপে পরিণত হয়। তখন শিক্ষার্থী হয়তো অনেকক্ষণ বইয়ের সামনে বসে থাকে, কিন্তু শেখার গভীরতা তৈরি হয় না।
ভিউয়ের নেশা, সস্তা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন আর শুধু ফেসবুকে সময় কাটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। টিকটক, রিলস ও শর্ট ভিডিওর দুনিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন এক প্রতিযোগিতা, কে কত বেশি ভিউ পাবে, কার ভিডিওতে বেশি লাইক আসবে, কে রাতারাতি পরিচিত মুখ হয়ে উঠবে। অনেকের কাছে জনপ্রিয়তা এখন আর দীর্ঘদিনের কাজ, জ্ঞান কিংবা দক্ষতার ফল নয়; বরং কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দিয়েই আলোচনায় আসার আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কখনো তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত, কখনো বিব্রতকর, আবার কখনো বিপজ্জনক কনটেন্ট। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে কেউ কেউ ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে তুলে ধরছে, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করছে, আবার কেউ এমন বিষয়কে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা তরুণদের চিন্তা ও রুচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সব কনটেন্ট বা সব ব্যবহারকারীকে একইভাবে বিচার করা যায় না। কিন্তু ভিউয়ের জন্য যেকোনো কিছু করার প্রবণতা যে উদ্বেগজনক, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
এখানে তৈরি হয়েছে এক ধরনের মানসিক ফাঁদ। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে ভিডিওর ভিউ বাড়ানোর কৌশলে। কখন পোস্ট দিলে বেশি মানুষ দেখবে, কীভাবে অনুসারী বাড়বে, কোন ট্রেন্ডে অংশ নিলে পরিচিতি পাওয়া যাবে,এসব ভাবনা তার সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিতে পারে। পড়াশোনার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের তুলনায় তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা তখন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ যেন ভুলে যাচ্ছে, ভিউ পাওয়া আর যোগ্যতা অর্জন এক বিষয় নয়। অনুসারীর সংখ্যা বাড়া মানেই দক্ষতা তৈরি হওয়া নয়। একটি ভাইরাল ভিডিও মুহূর্তের জন্য পরিচিতি এনে দিতে পারে, কিন্তু তা কোনো মানুষের ভবিষ্যৎ, জ্ঞান কিংবা পেশাগত সক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রযুক্তি দিয়ে আয়, নাকি দ্রুত টাকা কামানোর অপরিকল্পিত মোহ?
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের সুযোগ অবশ্যই ইতিবাচক। অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল কনটেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার একজন তরুণকে বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, যখন প্রযুক্তিকে দক্ষতা অর্জন বা পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যম হিসেবে না দেখে রাতারাতি টাকা কামানোর সহজ রাস্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেউ কেউ মনে করতে পারে, পড়াশোনা বা পেশাগত দক্ষতা অর্জনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন নেই; একটি ভাইরাল ভিডিও, কয়েকটি জনপ্রিয় পোস্ট কিংবা বিপুলসংখ্যক অনুসারীই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে দেবে। অথচ অনলাইন জনপ্রিয়তা অনিশ্চিত, ভিউয়ের সংখ্যা সব সময় স্থায়ী আয় তৈরি করে না, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও কারও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রযুক্তি থেকে আয় করতে হলে পরিকল্পনা, দক্ষতা, নিয়মিত পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শুধু ভিউয়ের পেছনে ছোটা কিংবা অন্যের সাফল্য দেখে দ্রুত অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখা কোনো স্থায়ী পথ নয়। বরং এই মোহ যদি শিক্ষার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তরুণেরা দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ হারাতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনপ্রিয়তা আর যোগ্যতা এক জিনিস নয়। ভিউ পাওয়া মানেই জ্ঞানী হওয়া নয়, অনুসারী বাড়া মানেই দক্ষতা তৈরি হওয়া নয়, আর অনলাইনে কিছু অর্থ আয় করলেই জীবনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি গড়ে ওঠে না। শিক্ষা, চিন্তাশক্তি, পেশাগত দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ,এসবের বিকল্প কোনো ভাইরাল ভিডিও হতে পারে না।
তাৎক্ষণিক আনন্দ বনাম দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি
বর্তমান ডিজিটাল সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। একটি ভিডিও পোস্ট করার পরপরই ভিউ দেখা, লাইক গোনা কিংবা অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে কি না, তা বারবার পরীক্ষা করার অভ্যাস অপেক্ষা ও ধৈর্যের ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। অথচ পড়াশোনা এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে সাফল্য আসে নিয়মিত অনুশীলন, ভুল সংশোধন এবং দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করার মাধ্যমে।
পরীক্ষার ফলাফল এক দিনে তৈরি হয় না। একজন শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি, অনিয়মিত পড়াশোনা কিংবা মনোযোগের সমস্যা অনেক দিন ধরে জমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফল সেই ঘাটতির প্রতিফলন ঘটাতে পারে। তাই ফলাফল প্রকাশের পর শুধু নম্বরের হিসাব না করে, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন অভ্যাস ও সময় ব্যবহারের ধরন নিয়েও আলোচনা জরুরি।
শিক্ষার্থীরা দিনে কত ঘণ্টা পড়াশোনা করছে, কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছে, আর কতটা সময় কাটাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে? তারা কি ফোনকে কাজে লাগাচ্ছে, নাকি ফোনই তাদের সময় ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা প্রয়োজন।
ফলাফল কি মোবাইল আসক্তির প্রমাণ?
এইচএসসির ফলাফলে অবনতি দেখে সরাসরি বলা যাবে না যে ফেসবুক, টিকটক কিংবা মোবাইল ফোনই এর একমাত্র কারণ। এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে শিক্ষার্থীদের দৈনিক স্ক্রিন-টাইম, পড়াশোনার অভ্যাস, ঘুম, পারিবারিক পরিবেশ, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তবে ফলাফল একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: শিক্ষার্থীরা কীভাবে সময় ব্যবহার করছে? মোবাইলের ব্যবহার কি তাদের পড়াশোনার সময় ও মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা কি তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে? এসব প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না।
কারণ শিক্ষার সংকট শুধু পাঠ্যবই বা শ্রেণিকক্ষের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন অভ্যাস, পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশ এবং সামাজিক সংস্কৃতিও তার শেখার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলাফল তাই একদিকে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানায়, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল অভ্যাস নিয়েও আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে।
উন্নত বিশ্বেও বাড়ছে উদ্বেগ, আসছে বিধিনিষেধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং শিশু-কিশোরদের ওপর এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ এখন আর শুধু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে অস্ট্রেলিয়া শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বয়সসীমা কার্যকর করেছে। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশটিতে ১৬ বছরের কম বয়সীরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট রাখতে পারছে না। মালয়েশিয়াও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বয়সভিত্তিক বিধিনিষেধ কার্যকর করেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ও আলোচনা চলছে।
এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা, সাইবার বুলিং, অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তিকর নকশা নিয়ে উদ্বেগ। অর্থাৎ প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে এর সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষার বিষয়টিও উন্নত দেশগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে।
এখানে বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়; বরং বয়স, প্রয়োজন ও দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পড়াশোনার সময়, ঘুম, পারিবারিক যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত বিকাশ যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাছে জিম্মি না হয়ে পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, উন্নত দেশগুলো যখন শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহারের বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন?
শুধু শিক্ষার্থীকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না
মোবাইল ফোন হাতে থাকা মানেই একজন শিক্ষার্থী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে,এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাবের কথা বললেই তা প্রযুক্তিবিরোধিতা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেওয়া নয়; ফোন ব্যবহারের নিয়ম, পড়াশোনার সময় এবং ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতেও সহায়তা করা। তবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনা করে নির্দিষ্ট সময়, পড়ার সময় ফোন দূরে রাখা, রাতে ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং শিক্ষামূলক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে ব্যর্থতার দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, পড়ার কৌশল, সময় ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল সচেতনতা নিয়ে কার্যকর পরামর্শ ও সহায়তা প্রয়োজন। পরিবারের বড়দেরও নিজেদের আচরণ পর্যালোচনা করা দরকার। সন্তানকে মোবাইল কম ব্যবহার করতে বলেও যদি অভিভাবক সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে কথার চেয়ে আচরণই বেশি প্রভাব ফেলবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে তা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।
নতুন প্রজন্মের হাতে প্রযুক্তি, নাকি প্রযুক্তির হাতে নতুন প্রজন্ম?
স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বাস্তবতা থেকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং নতুন প্রজন্মকে প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার শেখাতে হবে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শিক্ষার বিকল্প না হয়, বিনোদন যেন দায়িত্বকে গ্রাস না করে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন বাস্তব জীবনের লক্ষ্য থেকে শিক্ষার্থীকে দূরে সরিয়ে না দেয়,সেই ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
এইচএসসির ফলাফল আমাদের সতর্ক করেছে। এটি শুধু পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বরের হিসাব নয়; এটি শিক্ষার্থীদের সময়, মনোযোগ ও শেখার অভ্যাস নিয়ে আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ। ফেসবুক বন্ধ করে দিলেই শিক্ষার সব সমস্যা মিটে যাবে না। আবার ফেসবুক, টিকটক ও মোবাইল ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা না করলেও চলবে না। নতুন প্রজন্মের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ,একদিকে শেখার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, অন্যদিকে ভিউ, লাইক, ফলোয়ার ও দ্রুত অর্থ উপার্জনের মোহের মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎকে হারিয়ে না ফেলা। প্রযুক্তি যেন তাদের সম্ভাবনার সিঁড়ি হয়, মনোযোগ ও স্বপ্নের কবর না হয়, এ দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীর নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজেরও। কারণ যে মোবাইল জ্ঞান অর্জনের দরজা খুলে দিতে পারে, সেই মোবাইলই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে শিক্ষার্থীর সময়, মনোযোগ ও সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। এখন প্রশ্ন,আমরা কি সন্তানদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দিয়ে তার সঠিক ব্যবহার শেখাচ্ছি, নাকি প্রযুক্তির প্রবাহে তাদের একা ছেড়ে দিচ্ছি?##

