সিরাজুর রহমান#
বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ৪১টি দেশ সাবমেরিন অপারেট করলেও কেবল ৬টি দেশের নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে ডেডিকেটেড ও শক্তিশালী নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন। আর এই এলিট ক্লাবের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ভারতের নাম। চলতি ২০২৫ সালে ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৬৬টি, রাশিয়ার ৩৫টি, চীনের ১২-১৩টি, যুক্তরাজ্যের ৯টি, ফ্রান্সের ৯টি এবং ভারতের কাছে ২টি করে নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন অপারেশনাল রয়েছে।
তবে বাস্তবে এই জাতীয় সাবমেরিনের শ্রেণিবিন্যাস, রিফিট বা ডিকমিশনিংয়ের কারণে প্রকৃত সংখ্যা সময়ে সময়ে সামান্য হেরফের হতে পারে। আবার ক্যাটাগরি অনুযায়ী নিউক্লিয়ার সাবমেরিনকে সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
SSBN (Strategic Ballistic Missile Submarine): এটিকে দীর্ঘ-পাল্লার পারমাণবিক ব্যালিস্টিক মিসাইল বহনে সক্ষম, কৌশলগত প্রতিরোধ বা নিউক্লিয়ার ডিটারেন্সের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। SSN (Nuclear-powered Attack Submarine): এই জাতীয় সাবমেরিন শত্রু সাবমেরিন/সারফেস শিপ ধ্বংস, এসকোর্ট, সাগরের বুকে নজরদারি ও বিশেষ মিশনের জন্য ব্যবহার করা হয়। SSGN (Guided Missile Submarine): ক্রুজ মিসাইল ও প্রিসিশন স্ট্রাইকে বিশেষায়িত এই সাবমেরিন সাগরের বুকে থাকা টার্গেটের পাশাপাশি ভূমি ভিত্তিক টার্গেটে ক্রুজ মিসাইল দ্বারা হামলা করে।
তাছাড়া ওজনের দিক থেকে আধুনিক নিউক্লিয়ার সাবমেরিনগুলোর ডিসপ্লেসমেন্ট সাধারণত প্রায় ৭ থেকে ১৫ হাজার টন হয়ে থাকে। তবে বৃহৎ আকারের কৌশলগত SSBN শ্রেণির ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি হতে পারে।
নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের প্রধান কৌশলগত শক্তি হলো অসাধারণ এনডুরেন্স (endurance) ও আনলিমিটেড রেঞ্জ। যদিও তা মূলত ক্রুদের খাবার/রসদই রেঞ্জের সীমা নির্ধারণ করে। নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিনের পে-লোড ক্যাপাসিটিও প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের তুলনায় আনুমানিক ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি হতে পারে।
প্রকারভেদে একটি আধুনিক নিউক্লিয়ার ফিশন (Nuclear Fission) রিয়্যাক্টর সমৃদ্ধ সাবমেরিন এর সার্ভিস লাইফ টাইম সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত (কিছু নকশায় এরও বেশি) হয়ে থাকে। যা মাত্র একবার বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি নিয়ে সাগরের বুকে দীর্ঘ সময় ব্যাপী আনলিমিটেদ রেঞ্জে নেভাল কমব্যাট মিশন পরিচালনা করতে পারে।
যার ফলে সাগরের বুকে দীর্ঘ মেয়াদে কনটিনিউয়াস ডিটারেন্স বা টানা টহল এবং নজরদারি বজায় রাখা সম্ভব হয়। আবার ব্যয় বিবেচনায় একটি আধুনিক ও বিশ্ব মানের নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিন তৈরি করতে সাধারণত প্রায় ২ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি (বিশেষ করে বৃহৎ SSBN-এ) খরচ হতে পারে। এই আনুমানিক হিসাব সাধারণত সাবমেরিনের ডিজাইন, সেন্সর-সুইট, অস্ত্রব্যবস্থা ও রিয়্যাক্টর কনফিগারেশনের ওপর নির্ভর করে।
প্রযুক্তিগতভাবে নিউক্লিয়ার সাবমেরিনে শক্তি উৎপন্ন হয় নিউক্লিয়ার ফিশন (Nuclear Fission) প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে। শক্তি উৎপাদনের জন্য এতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU) ব্যবহার করা হয়। তবে অনেক দেশ যেমন চীন আবার লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম (LEU) নিয়েও উন্নত কোর বা রিএক্টর ডিজাইন করছে।
পরিশেষে বলা যায়, নিউক্লিয়ার পাওয়ারড সাবমেরিনে খুবই অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে বিপুল শক্তি পাওয়া যায় বলে এসব সাবমেরিন বহু বছর ধরে রিফুয়েলিং ছাড়াই চলতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ও জাপানসহ কয়েকটি দেশ অত্যাধুনিক কনভেনশনাল (ডিজেল-ইলেকট্রিক/AIP) সাবমেরিন উন্নয়ন করলেও, ব্লু-ওয়াটার অপারেশন ও দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক নেভাল মিশনে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন এখনও সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে যাচ্ছে।##

