সিরাজুর রহমান#
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ দেশ যখন চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরিতে সংগ্রাম করছে, ঠিক তখন চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ষষ্ঠ প্রজন্মের হাইপার-অ্যাডভান্সড এরিয়াল কমব্যাট সিস্টেমের প্রতিযোগিতায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এই প্রতিযোগিতার এবার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে চীনের ‘জে-৩৬’ যুদ্ধবিমান, যার দ্বিতীয় প্রটোটাইপ গত অক্টোবর মাসের শেষের দিকে উন্মোচন করেছে রেড জায়ান্ট চীন।
আসলে গত ২০২৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর চিনের চেংদু এভিয়েশন কর্পোরেশন তাদের নতুন ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রথম প্রটোটাইপ উন্মোচন করে। যার সিরিয়াল নম্বর ছিল ৩৬০১১। আর এবার মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় প্রটোটাইপের সফল উড্ডয়ন চীনের এভিয়েশন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মূলত তিন ইঞ্জিনবিশিষ্ট (হাইলি আপগ্রেডেড ডাব্লিউএস-১০/১৫ ইঞ্জীন), লেজবিহীন, ডেল্টা উইং ডিজাইনের এই স্টেলথ এয়ারক্রাফটটিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘জে-৩৬’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। চীন এটিকে পরীক্ষামূলকভাবে আকাশে পরীক্ষামূলকভাবে উড্ডয়ন করলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে সার্ভিসে আসতে হয়ত প্রায় ২০৩২-৩৫ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন,চীন তাদের শক্তিশালী জেট ইঞ্জিনের ঘাটতির কারণে হয়ত তিনটি ইঞ্জিন ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে অদুর ভবিষ্যতে এটি সার্ভিসে আসলে এর রক্ষণাবেক্ষণকে অনেকটাই ব্যয়বহুল ও জটিল করে তুলতে পারে। আনুমানিক ৪৫ টন ওজনের এই যুদ্ধবিমানে পিএল-১৭-এর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের তৈরি জে-৩৬ অ্যাডভান্স এয়ারক্রাফটকে ফিউচারিস্টিক টগেকনোলজি হিসেবে ISR, deep strike এবং electronic warfare-এর মতো মাল্টি-মিশন এয়ার কমব্যাট সক্ষমতার উপযোগী করে ডিজাইন ও তৈরি করা হচ্ছে। যদিও এ নিয়ে চীনের তরফে কোন তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এর পাশাপাশি এতে আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স (AI) বেসড network-centric warfare, human-machine teaming এবং loyal wingman কনসেপ্ট অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চেষ্টা করছেন চীনের প্রযুক্তিবিদেরা। যা কিনা বিশ্বের প্রথম সামরিক সুপার পাওয়ার আমেরিকার NGAD (Next Generation Air Dominance) প্রকল্পের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গোপনে গত এক দশক থেকে তাদের নতুন কনসেপ্টের এরিয়াল টেকনোলজি নিয়ে কাজ করে গেলেও বাস্তবে এখনো তাঁরা ষষ্ঠ প্রজন্মের কোনো যুদ্ধবিমানের প্রটোটাইপ উন্মোচন করেনি। তবে তাদের পঞ্চম প্রজন্মের হাইলি অ্যাডভান্স এফ-২২ র্যাপটর, এফ-৩৫ লাইটনিং এবং অতি উচ্চাভিলাষী বি-২১ রেইডার বোম্বার এয়ারক্রাফট আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ শুরু করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়া তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির এসইউ-৫৭ ফেলন এবং চীন তার জে-২০ এবং জে-৩৫ অ্যাডভান্স স্টেলথ ফাইটার জেট প্রজেক্ট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে রাশিয়ার তাদের আরেকটি নতুন এসইউ-৭৫ স্টেলথ ফাইটার জেট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করলেও খুব সম্ভবত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাবে এখনো আলোর মুখ দেখেনি কিংবা এই প্রজেক্ট হয়ত বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বিশ্বের অন্যান্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং জাপান এখনো পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ডিজাইন ও গবেষণার ক্ষেত্রে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। তবে পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রযুক্তির এরিয়াল সিস্তেমের মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর একটি ডেডিকেটেড এবং নিজস্ব প্রযুক্তির ইঞ্জিন, এভিয়নিক্স ও এয়ারফ্রেম স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তৈরি করা।
তবে তুরস্কের “কান” এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কেএফ-২১ নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বেশকিছু প্রোটোটাইপ ফ্লাইট সফল হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে হয়ত সার্ভিসে আসতে আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। যদিও তার্কিস অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিআইএ) আগামী ২০২৮ সালের আগেই তাদের নতুন প্রজন্মের কান স্টেলথ ফাইতার জেট এর ম্যাসিভ প্রডাকশন লাইন চালু করার বিষয়ে প্রবলভাবে আশাবাদী।
এখানে প্রকাশ থাকে যে, একটি ডেডিকেটেড এবং উচ্চ প্রযুক্তির ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেবল স্টেলথ প্রযুক্তি সমৃদ্ধ হবে না, বরং AI-চালিত, হাইপারসনিক অস্ত্রবাহী, মাল্টি-ডোমেইন অপারেশন সক্ষম এবং নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক যুদ্ধ ব্যবস্থার উপযোগী হতে হবে। তাই নতুন এই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু শক্তি প্রদর্শনের বিশয় নয়, বরং ফিউচারিস্টিক ইনোভেশন, নিবিড় রিসার্চ এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র রূপান্তরের এক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।##
-- বিজ্ঞাপন ---
পূর্ববর্তী সংবাদ

