-- বিজ্ঞাপন ---

মহাভূমিকম্পেও কম ক্ষয়ক্ষতি: জাপানের সাফল্যের পেছনের বিজ্ঞান

কাজী আবুল মনসুর#

জাপান পৃথিবীর “Pacific Ring of Fire” অঞ্চলের একটি অত্যন্ত সক্রিয় অংশে অবস্থিত, যেখানে ভিন্ন টেকটনিক প্লেটগুলোর সঞ্চার ও সাবডাকশন নিয়মিত ভূমিকম্পের কারণ। গত ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর থেকে, দেশটি দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অনেক উন্নতি করেছে — কিন্তু এমন তীব্র কম্পন এখনও জনজীবন ও অবকাঠামোর জন্য বড় হুমকি।

ভূমিকম্পের মাত্রা জানতে পেয়ে JMA শুরুতে ৩ মিটার পর্যন্ত সুনামি আসার সম্ভাবনা জানিয়ে সতর্কতা জারি করে। প্রায় ৯০,০০০ জন বাসিন্দাকে জরুরিভাবে উচ্চভূমিতে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। উপকূলীয় বেশ কিছু পোর্ট-এ ২০–৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ঢেউ দেখা গেছে। আশঙ্কা থাকায় কিছুদিনের জন্য ভূপৃষ্ঠ নড়াচড়ার দিকে বিশেষ নজর রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৩০–৩৩ জনের মতো আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে; প্রাণহানির কোনো বড় খবর পাওয়া যায়নি। রেল ও দ্রুতগতির ট্রেন (shinkansen) সার্ভিস সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল; পরে পর্যায়ক্রমে চালু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছিল, তবে ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশই পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে এখনো কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, কারণ আগামী এক-সপ্তাহের মধ্যেকার “aftershocks” বা পরবর্তী কম্পনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানের ভূমিকম্পপ্রবণ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটেছিল ২০১১ সালের ১১ মার্চ। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৯.০, যা শুধু জাপান নয়—বিশ্বের আধুনিক ইতিহাসেও অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল হোনশু দ্বীপের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছে, সমুদ্রের প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে। কম্পনের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে পুরো দেশ দুলে ওঠে, টোকিওর সুউচ্চ ভবনগুলোসহ। ভূমিকম্পের মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়াবহ সুনামি উপকূলে আঘাত হানে, যার ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সড়কপথ—সবকিছু ভেঙে পড়ে। ফুকুশিমা দাই-ইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মারাত্মক ক্ষতি হয়, যা সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক সংকটগুলোর একটি তৈরি করে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। দেশের পূর্বাঞ্চলের বহু শহর ও গ্রাম সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জাপান এরপর পুনর্গঠন, উদ্ধার, আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি আরও কঠোর করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ভবন নির্মাণ, সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা এবং জনগণকে প্রশিক্ষণের ওপর আরও বেশি জোর দিয়েছে দেশটি। নিয়মিতই ৬ থেকে ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প কাঁপায় জাপানকে। তবুও দেশটিতে ভবন ধস বা ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত নির্মাণ প্রযুক্তি, কঠোর বিল্ডিং কোড এবং দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থার কারণেই জাপান প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি সফল। মাটি নড়লেও স্থির থাকে ভবন । জাপানের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নিচে ব্যবহৃত হয় বেস আইসোলেশন প্রযুক্তি। এতে ভবনটি বিশেষ রাবার, স্প্রিং বা বল-বিয়ারিংয়ের ওপর ভর করে থাকে। ভূমিকম্পের সময় মাটি দুললেও ভবন তুলনামূলক স্থির থাকে, কম্পনের ধাক্কা ভবনের কাঠামোতে কম লাগে। ড্যাম্পিং সিস্টেম এ শক শোষণ করে ভিতরে থাকা ‘অদৃশ্য সুরক্ষা’ ভবনের ভেতরে স্থাপিত ড্যাম্পার যন্ত্রগুলো বড় শক-অ্যাবজর্বারের মতো কাজ করে। কম্পন শুরু হওয়ামাত্র এগুলো শক্তি শোষণ করে দুলুনি কমিয়ে আনে। অনেক ভবনে ব্যবহৃত হয় লিকুইড, স্টিল বা ফ্রিকশন ড্যাম্পার—যা ভবনকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে। কঠোর বিল্ডিং কোড রয়েছে জাপানে। এটি কাগজে নয় বাস্তবে প্রয়োগ হয়।

জাপানের নির্মাণবিধি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বলে বিবেচিত। প্রতিটি ভবনকে নির্দিষ্ট মাত্রার ভূকম্পন সহ্য করার ডিজাইন বাধ্যতামূলক। পুরনো ভবন রেট্রোফিট করে নতুন মানে আনা হয়। স্কুল, হাসপাতাল, ব্রিজ—সব জায়গায় আলাদা সিসমিক মানদণ্ড রয়েছে। নিয়ম ভাঙার সুযোগ নেই; নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। ভবনের নমনীয় নকশা রয়েছে যাতে এটি ভাঙবে না, দুলবে । কঠিন স্টিল ফ্রেম, ক্রস-ব্রেসিং, এবং ফ্লেক্সিবল জয়েন্ট ব্যবহার করে ভবনকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন ভূমিকম্পে কাঁপলেও শক্তি শোষণ করে ভেঙে না পড়ে। এ কারণেই একই মাত্রার ভূমিকম্পে অন্যান্য দেশে যেখানে বড় ক্ষতি হয়, জাপানে ভবনগুলো টিকে যায়। দ্রুত সতর্কতার কারনে সেকেন্ডের মধ্যে বন্ধ হয় ট্রেন-ফ্যাক্টরি জাপানের Earthquake Early Warning System পৃথিবীর দ্রুততম সতর্কতাগুলোর একটি।

ভূমিকম্পের উৎসে কম্পন শুরু হওয়া মাত্রই সারা দেশে সতর্কতা পাঠানো হয়। শিনকানসেন ট্রেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে থেমে যায় এলিভেটরগুলো তাৎক্ষণিকভাবে পরবর্তী তলায় থামিয়ে দেয় । শিল্পকারখানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরুরি সিস্টেম চালু করে। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেক কমে আসে। ছোটবেলা থেকেই মহড়া শুরু হয় ভুমিকম্পের। ১ সেপ্টেম্বরকে জাপান ‘দুর্যোগ প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করে। প্রতিবছর সারা দেশে বড় মহড়া হয়। স্কুলশিক্ষা, পরিবারভিত্তিক প্রস্তুতি, এবং ব্যক্তিগত ইমার্জেন্সি কিট—সবই নিয়মিত চর্চার অংশ।

সেন্সর-ভিত্তিক স্মার্ট সিটি ব্যবস্থা কার্যকর এখানে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করা হাজারো সেন্সর মাটির কম্পন, ভবনের নড়াচড়া, গ্যাস লিকসহ নানা তথ্য রিয়েল টাইমে বিশ্লেষণ করে। সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ব্যবস্থা নেয়। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্পেও জাপানের শহরগুলো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধসের ঘটনা কম, আগুন বা গ্যাস বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, আর উদ্ধার অভিযানও দ্রুত শুরু করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।##ছবিঃনিপ্পন ডট কম