-- বিজ্ঞাপন ---

মধ্যযুগের আরবি কবিতায় লুকানো সুপারনোভা SN 1181–এর চমকপ্রদ আবিষ্কার

প্রাচীন সাহিত্য ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন সংযোগ

সিরাজুর রহমান##
সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাশ গবেষণায় এক চমকপ্রদ তথ্য বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা। মূলত জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মধ্যযুগের আরবি কবিতা ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করে হারিয়ে যাওয়া একটি সুপারনোভা বা নক্ষত্রের মৃত্যুর অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন।
বিশেষ করে দ্বাদশ শতাব্দীর একটি আরবি কবিতার ছন্দে সুপারনোভা এসএন ১১৮১ (SN 1181) এর অস্তিত্ব শনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা, যা আগে কেবল প্রাচীন চীন ও জাপানি ইতিহাসের রেকর্ড থেকে জানা যায়। আর বিজ্ঞানীদের নতুন এই আবিষ্কার প্রাচীন রেকর্ডের সঙ্গে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন মেলবন্ধন বা সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
সম্প্রতি Astronomical Notes (অথবা Astronomische Nachrichten) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়, নিউহাউসার ও তার সহকর্মীরা মিশরের কায়রো থেকে প্রাপ্ত দুটি মধ্যযুগীয় আরবি গ্রন্থে উল্লেখিত ঐতিহাসিক সুপারনোভার বিষয়ে নিবিড়ভাবে তদন্ত করেছেন।
এর মধ্যে একটি হলো ইবনে সানা’ আল-মুলকের একটি কবিতা, যা ১১৮১ থেকে ১১৮২ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল। কবিতাটি সুলতান সালাহউদ্দিনের প্রশংসায় রচিত হয়। যিনি তৎকালীন সময়ে মিশর ও অন্যান্য অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত মুসলিম সেনাপতি বা সুলতান ছিলেন।
অন্য উৎস হিসেবে কাজ করেছে মিশরীয় পণ্ডিত আহমেদ ইবনে ‘আলী আল-মাকরিজির একটি ক্রনিকল, যিনি ১৩৬৪ থেকে ১৪৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বসবাস করতেন। তাছাড়া চীন ও জাপানের প্রাচীন রেকর্ডগুলোতেও ১১৮১ সালের একটি সুপারনোভার উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পর্যন্ত আকাশে এই সুপারনোভার বাস্তব অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য উপাত্ত নেই। তার মানে আজকের জ্যোতির্বিদদের কাছে নিশ্চিত হওয়া কঠিন যে, ঐতিহাসিকভাবে আরবি কবিতায় বর্ণিত এই ঘটনা বাস্তবে কোন সুপারনোভার অবশিষ্টাংশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। আর বিজ্ঞানীরা এখনও বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করে যাচ্ছেন।
আসলে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুপারনোভা হলো বিশাল আকার ও ভরসম্পন্ন কোনো নক্ষত্রের মৃত্যুর সময়কার মহাজাগতিক বিস্ফোরণ। সাধারণত সূর্যের অপেক্ষা কমপক্ষে ৮-১০ গুণ বা তার বেশি ভরের নক্ষত্র তার লাইফ সাইকেল শেষে প্রচণ্ড শক্তির বিস্ফোরণ ঘটায় এবং মহাকাশে বিপুল পরিমাণ ধুলো ও গ্যাস নিক্ষেপ করে।
সুপারনোভার আলো বা উজ্জ্বলতা এতই তীব্র হয় যে, তা দিনের আলোতেও দেখা যেতে পারে। জ্যোতির্বিদরা মনে করেন, এই বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বে শুরু হয় নতুন ও নবীর তারার জন্ম। তাই সুপারনোভা কোন নক্ষত্রের বিলুপ্তির কারণ হলেও তাকে নতুন নক্ষত্রের জন্মস্থান কিংবা নার্সারী বললেও কোন ভূল হবে না।
তবে প্রাচীনতম সুপারনোভা রেকর্ডগুলোর মধ্যে একটি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৪৫০০-১০০০ অব্দের মধ্যে ভারতের বুরজাহামা অঞ্চলে প্রস্তরখোদাইয়ে লিপিবদ্ধ করা ছিল। এরপর, খ্রিস্টাব্দ ১৮৫ সালে চীনা জ্যোতির্বিদরা আরেকটি সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করেন, যার নাম দেওয়া হয় এসএন ১৮৫।
আর এবার মধ্যযুগের বা ১২শ-১৩শ শতাব্দীর মধ্যে রচিত আরবি কবিতার মাধ্যমে এক অজানা এসএন ১১৮১ নামক সুপারনোভার অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা বাস্তবে সাহিত্য, ইতিহাস ও বিজ্ঞানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক ঘটনার তথ্য সংযোগ বা মেলবন্ধন হিসেবে মনে করা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্য যুগের আরবি কবিতায় বিজ্ঞানীদের দ্বারা খুঁজে পাওয়া এই সুপারনোভা বা নক্ষত্রের মৃত্যুর তথ্য খুঁজে পাওয়া প্রমাণ করে যে, প্রাচীন সাহিত্য, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা প্রস্তরখণ্ডে লিপিবদ্ধ মহাজাগতিক ঘটনার মূল্যবান বা চমকপ্রদ তথ্য-উপাত্ত লুকিয়ে থাকতে পারে, যা আমাদের উচ্চস্তরের মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিক উন্মোচনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তথ্যসূত্র: Popular Science, Wikipedia, Univers Space Tech