সিরাজুর রহমান#
ইরানের আর্থিক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় এখন ১১,৪৬,০০০ ইরানি রিয়াল (IRR)। প্রতি মার্কিন ডলার লেনদেন হয়েছিল ১১,৫২,০০০ রিয়ালে। ডলারের বিপরীতে ইরানের রিয়ালের এই সামান্য মূল্য বৃদ্ধি দেশটির মুদ্রার হালকা উত্থানের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে দেশটির ডলার সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। মূলত বেশকিছু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক অবরোধের কারণে সামগ্রিকভাবে ইরানের মুদ্রাবাজার এখনো অস্থির অবস্থায় রয়েছে।
উইকিপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, চলতি ২০২৫ সালে ইরানের নমিনাল জিডিপির আকার ৪৯০.০১ বিলিয়ন ডলার দেখানো হলেও বাস্তবে দেশটির হাতে বৈদেশিক দেনা ও আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো মাত্র ২৩.৬ বিলিয়ন ডলারের (২০২৪) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। অন্যদিকে স্বর্ণের মজুত থাকতে পারে প্রায় ৭.৬৯ বিলিয়ন ডলার বা তার কিছুটা অধিক মূল্যের।
তবে দেশটির কাস্টমস পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৪০৩ সালে ইরান প্রায় ১০০ মেট্রিক টন সোনা আমদানি করেছিল, যার আনুমানিক মূল্য হতে পারে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক সোনার দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকৃত সোনার চালানের বর্তমান মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে গেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের জাতীয় অর্থনীতি যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে গেলেও দেশটির বৈদেশিক ঋণ ও সার্বিক দেনার পরিমাণ এখনো তুলনামূলকভাবে সহনীয় অবস্থানে রয়েছে। চলতি ২০২৫ সালের ২০শে মার্চের হিসেব অনুযায়ী ইরানের মোট বৈদেশিক ঋণ ও দেনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা আগের ২০২৪ সাল অপেক্ষা অনেকটাই কম।
এই বৈদেশিক ঋণের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদী ঋন এবং ১.৭৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইরানের বৈদেশিক ঋণের আকার ও পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কারণ দেশটি তার অবকাঠামো ও শিল্প উন্নয়নের জন্য বিদেশী ঋণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং বিনিয়োগকারী মূলধনের উপর অধিক জোর দিয়েছে। যার সুফল বাস্তবে দেশটি এখন ভোগ করছে।
চলতি ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্র (SCI) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, তৃতীয় ইরানি মাস খোরদাদ (২২ মে – ২১ জুন, ২০২৫) শেষে শেষ হওয়া বারো মাসের সময়কালে ইরানের মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৩৪.৫% দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় ০.৬% বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া একই সময়ে সার্বিক বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৯%।
ট্রেডিং ইকোনমিক্স অনুসারে, চলতি ২০২৫ সালে ইরানের বেকারত্বের হার প্রায় ৭.৫% হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়, যা গত ২০২৪ সালের প্রকৃত ৭.২০% হার থেকে বেশি। তবে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ সাল শেষে দেশটির মোট বেকারত্বের হার জন্য ৯.৫% এর সীমা অতিক্রম করতে পারে।
চলতি ২০২৫ সালের ইরানের বাস্তব বৈদেশিক বাণিজ্যের অবস্থা বা রপ্তানি/আমদানি চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি, তবে ১ মার্চ, ২০২৫ তারিখে শেষ হওয়া ১১ মাসে মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের আকার ছিল প্রায় ১১৭ বিলিয়ন ডলার। যার মধ্যে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৭০.৫ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ব্যয় ছিল প্রায় ৪৬.৫ বিলিয়ন ডলার।
পরিশেষে বলা যায়, বহু বছরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও ইরান আজও তার অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। ডলার সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও চরম বেকারত্ব সমস্যা সত্ত্বেও ইরান এখন স্বনির্ভর শিল্পায়ন ও নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।##

